অপরাধ

অবহেলায় মৃত্যু যখন হত্যাকাণ্ড

  admin_news ৮ এপ্রিল ২০২৬ , ৭:১৭ এএম প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বজুড়ে আইনি বিবর্তনের ধারায় এটি প্রতিষ্ঠিত যে, চরম গাফিলতি বা দায়িত্বহীনতার ফলে সৃষ্ট মৃত্যু কেবল দুর্ঘটনা নয়, বরং তা ‘অবহেলার কারণে হত্যাকাণ্ড’ (Negligent Homicide) হিসেবে গণ্য। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশের আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে এ বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টও সম্প্রতি চিকিৎসায় অবহেলাজনিত মৃত্যুকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার যুগান্তকারী নির্দেশনা দিয়েছেন।আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনি নজির
অবহেলার কারণে মৃত্যুর দায়ে ফৌজদারি বিচারের নজির দীর্ঘদিনের
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় ডে কেয়ার সেন্টারের অবহেলায় ৫ শিশুর মৃত্যু এবং ২০২০ সালে নিউইয়র্কের কুইন্স সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অপরাধমূলক অবহেলাজনিত মৃত্যুকে সরাসরি হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্য ১৯৬৮ সাল থেকেই দেশটিতে চিকিৎসার গাফিলতিকে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশ ২০২০ সালের ১৫ জুন বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন হাই কোর্ট বেঞ্চ এক আদেশে জানান যে, চিকিৎসায় অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারা অনুযায়ী, বেপরোয়া বা অবহেলামূলক কাজের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটানোকে আইনিভাবে দণ্ডিত করা হয়।অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ আইন অনুযায়ী, যে কাজগুলো মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও অসতর্কভাবে করা হয়, সেগুলোই এই সংজ্ঞায় পড়ে, চিকিৎসক বা হাসপাতালের চূড়ান্ত দায়িত্বহীনতা।
পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিক নিয়োগ।
দ্রুতগতি বা নিয়ম না মেনে যানবাহন চালানো।
পেশাগত চরম অবহেলা  নিজ দায়িত্ব পালনে চরম শিথিলতা প্রদর্শন বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও বর্তমান স্বাস্থ্য বিপর্যয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা একটি ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
* গত দুই দশকের মধ্যে চলতি বছর হামে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ।
* ২০১৭ সালে যেখানে মৃত্যুর হার ছিল ১০ লাখে ১ শতাংশ, তা বর্তমানে লাফিয়ে ১৬.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
* ইপিআই (EPI) কর্মসূচির মাধ্যমে গত কয়েক দশকে টিকা প্রদানের হার ৮৪ শতাংশে উন্নীত হলেও, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে টিকাদানে চরম স্থবিরতা দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালে সময়মতো টিকা না দেওয়াই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি অব মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশনের প্রধান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমানের মতে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় দেশ পিছিয়ে গেছে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ১৩৮ জন শিশুর মৃত্যু ও হাজার হাজার আক্রান্তের পেছনে প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করা হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের অযোগ্যতা এবং টিকা কার্যক্রম স্তিমিত হওয়া এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। এছাড়া, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই অদক্ষতার দায় এড়াতে পারেন না বলে আইনি নোটিশে দাবি করা হয়েছে।

“একটি সভ্য সমাজে অবহেলায় শিশুর মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। এটি কেবল অবহেলা নয়, বরং আইনের দৃষ্টিতে পরিকল্পিত দায়হীনতা।”

প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা।
মানবাধিকার সংগঠনের ভূমিকাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আইনি সহায়তা প্রদান।

দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতার দায়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও আইনের মুখোমুখি করা।
দেশের আইনের শাসন ও শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই মৃত্যুগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও প্রতিকার এখন সময়ের দাবি।

Facebook Comments Box