শ্রেণিকক্ষে ঢুকলেই এখন এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা সামনে আসে। মনোযোগহীন দৃষ্টি, ক্লান্ত ও অবসন্ন মুখ, আর মুঠোফোনে ডুবে থাকা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি—এই দৃশ্য যেন নতুন স্বাভাবিকতা। শিক্ষার পরিবেশ ক্রমেই হারাচ্ছে তার প্রাণ, যেখানে একসময় জ্ঞানপিপাসু ও সৃজনশীল শিক্ষার্থীদের সরব অংশগ্রহণ ছিল স্বাভাবিক চিত্র।
প্রযুক্তির অপ্রতিহত বিস্তার, বিশেষ করে স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা, শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলছে। অতিরিক্ত টাচস্ক্রিন ব্যবহারের ফলে শিশুদের শারীরিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে—তারা ঠিকভাবে পেনসিল ধরতেও পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মনোযোগের ঘাটতি, শেখার আগ্রহের হ্রাস এবং মানসিক অবসাদ।
যদিও গত কয়েক দশকে দেশের শিক্ষা খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ভর্তির হার বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু শেখার গুণগত মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘শিখনঘাটতি’। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও বহু শিক্ষার্থী মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা গঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এদিকে শিক্ষা ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। পরিবারের ওপর শিক্ষার আর্থিক চাপ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাইভেট টিউশন, কোচিং ও গাইডবই নির্ভরতা শিক্ষাকে একটি ব্যয়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ভর্তির হার কমছে। আর্থিক চাপে শিশুশ্রম বাড়ায় ছেলেদের ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। এই দ্বিমুখী সংকট একটি বড় জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি সমন্বিত ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। সাধারণ শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা ও কারিগরি ধারায় বিভক্ত এই ব্যবস্থায় একক মানদণ্ড ও লক্ষ্য নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে, শিক্ষাব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। কেবল পাঠ্যসূচির পরিবর্তন নয়, বরং শিক্ষার দর্শন ও প্রয়োগে পরিবর্তন আনতে হবে। নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণক্ষমতা ও বাস্তব দক্ষতাকে শিক্ষার মূল ভিত্তিতে স্থাপন করতে হবে।
সাম্প্রতিক নীতিগত উদ্যোগগুলো—শিক্ষায় বাজেট বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্ব—সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এবং কার্যকর শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষার মান দিয়ে। সেই মান যদি ভেঙে পড়ে, তবে উন্নয়নের সব অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এখন সময় দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার—কারণ আজকের শিক্ষার সংকটই আগামী দিনের রাষ্ট্রীয় সংকটে রূপ নিতে পারে।