০৭-০৫-২০২৬
গোলাম কিবরিয়া
বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি :
নদী পেরোলেই শহর, সেবা থাকে দূরে—
অসুখ এলে মৃত্যু আগে, চিকিৎসা আসে পরে।
কাগজে আছে হাসপাতাল, বাস্তবে শূন্য ঘর—
চিকিৎসার আগে পৌঁছে যায় মানুষের কবর।
বলছি পটুয়াখালীর বাউফলের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক জনপদ ‘চন্দ্রদ্বীপের কথা’। তেঁতুলিয়া নদীর উত্তাল ঢেউয়ের ওপারে—চর ব্যারেট, চর রায়সাহেব, চর মিয়াযান, মধ্যে মিয়াযান, চর দিয়ারা, চর কচুয়া, চর ওয়াডেল, চর নিমদি, চর ফ্যাডা রওশন, চর আলগী ও ভাড়ানীরচরসহ ১১টি গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠা এই দ্বীপে বসবাস প্রায় ৩০ হাজার মানুষের।
সবুজে ঘেরা এই জনপদ ভোরে কৃষি ও মৎস্য সম্পদে প্রাণ ফিরে পেলেও, আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা—এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই অনিশ্চিত পরিণতি। আধুনিক চিকিৎসা এখনো এই জনপদের মানুষের জন্য বিলাসিতা।
বাউফল সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা। সাধারণ সময়ে এই যাত্রা কষ্টকর হলেও সম্ভব, কিন্তু জরুরি মুহূর্তে সেটিই হয়ে ওঠে মৃত্যুর কারণ। প্রসূতি মা, স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী—যে-ই হোক, তাকে বাঁচাতে হলে পাড়ি দিতে হয় উত্তাল তেঁতুলিয়া নদী। এতে সময় লাগে প্রায় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট—আর এই সময়টুকুই অনেকের জীবনের শেষ সময় হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রতি বছর গড়ে ৫ থেকে ৭ জন মানুষ শুধু চিকিৎসা না পেয়ে বা হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যাচ্ছেন। বর্ষা বা দুর্যোগে যখন নৌ চলাচল বন্ধ থাকে, তখন সেই সংখ্যা আরও বাড়ে—যার কোনো সরকারি হিসাবও নেই।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একটি ইউনিয়নে ১টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র (UH&FWC), প্রতি ৬,হাজার জনসংখ্যার জন্য ১টি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ২০, মানুষের জন্য কমপক্ষে ৩টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থাকার কথা। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (CHCP), স্বাস্থ্য সহকারী (HA), পরিবার কল্যাণ সহকারী (FWA), পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (FWV), নিয়মিত টিকাদান (EPI), মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং মিডওয়াইফের মাধ্যমে নিরাপদ প্রসবসেবা নিশ্চিত থাকার কথা থাকলেও চন্দ্রদ্বীপে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।
২০১৩ সালে ছোট-বড় ১৫টি চর ও ১১টি গ্রাম নিয়ে ইউনিয়ন গঠিত হলেও ১৯৯৮ সালে স্থাপিত একটি মাত্র কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া এখানে আর কোনো স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে সেই ক্লিনিকটিও জনবল সংকটে কার্যত বন্ধ হয়ে জরাজীর্ণ, চিকিৎসার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যেখানে একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী থাকার কথা, সেখানে একজন সিএইচসিপি ছাড়া বাকি সব পদই শূন্য পড়ে আছে। এবং চলতি বছরের শুরু থেকে গত চার মাসে সরকারি ওষুধের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ কাগজে স্বাস্থ্যসেবা থাকলেও বাস্তবে পুরো ইউনিয়ন কার্যত চিকিৎসাবিহীন।
চর ওয়াডেল গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগম বলেন, আমার এ বয়সে অনেকবার দেখেছি, প্রসূতি মা কিংবা দুর্ঘটনার শিকার রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পারার কারণে মাঝ নদীতেই সব শেষ হয়ে গেছে। এই-তো গত মাসেই জমিজমা নিয়ে সংঘর্ষে আহত কালাইয়া ইউপির উজ্জ্বল কর্মকার নামে একজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মাঝ নদীতেই মারা গেছে। এই অভিশপ্ত বিচ্ছিন্নতা আমাদের আর কত প্রাণ কেড়ে নেবে জানি না।
জানা যায়, ২০২০-২৫ সাল এ পাঁচ বছরে জন্মদানের সময় বা পরে অন্তত ২৭টি শিশুসহ ৩০-৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালে চরমিয়াজান গ্রামের লিমা আক্তার ঝুমুর সন্তান প্রসবের সময় মারা যান। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চর ওয়াডেলের মালেক মাঝী ও বিদ্যুৎকর্মী হাসনাইনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে প্রাণ হারান। এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এই জনপদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
স্থানীয় বিউটি বেগম বলেন, বর্তমান যুগে ৩০ হাজার মানুষের জন্য একটি কার্যকর স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকা শুধু অবহেলা নয়, বড় ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
জহিরুল ইসলাম সোহাগ বলেন, এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই মৃত্যুঝুঁকি। বছরে ৫–৭টি মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?
চর ওয়াডেল কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই এলাকায় অন্তত আরও দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল এবং একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স জরুরি প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, একাধিকবার আবেদন করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
একই ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী সোলাইমান বলেন, যেখানে ৬ জন স্বাস্থ্য সহকারী থাকার কথা, সেখানে তিনি একাই কাজ করছেন। ওষুধের চাহিদা জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না। ২৪টি আউটরিচ টিকাদান কেন্দ্রে ৬ জন মাঠকর্মী থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে একজনও নেই। তিনি বলেন, একজন স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে পুরো ইউনিয়ন কাভার করা অসম্ভব। অনেক সময় মসজিদের মাইকিং করে মানুষ জড়ো করতে হয়, তাতেও বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল বসার মৃধা বলেন, আমরা উপজেলার বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বারবার দাবি জানিয়েছি এবং দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি সরকারি হাইস্পিড বোটের আবেদন করেছি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, একটি ক্লিনিক ছাড়া পুরো ইউনিয়নে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় তা গড়ে ওঠেনি। উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে নতুন ভবন নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে এবং পুরাতন ভবনগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
জনবল সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে জনবল ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নতুন সরকার এ বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। খুব দ্রুতই প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হবে বলে আশা করছি।
তিনি আরও বলেন, এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি ১০ শয্যার হাসপাতাল অত্যন্ত প্রয়োজন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালুর জন্য বিশেষ বরাদ্দের চেষ্টা চলছে।
পটুয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, চন্দ্রদ্বীপের মতো দুর্গম এলাকায় বছরে অন্তত দুই মাস ভাসমান হাসপাতাল সেবা চালু থাকে। তবে গত চার মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করে বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো ট্রাস্ট বা প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হওয়ায় সব কার্যক্রম সরাসরি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না।তিনি আরও বলেন, জনবল ঘাটতির বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং তা পূরণের চেষ্টা চলছে।
তেঁতুলিয়া নদী বেষ্টিত এই জনপদে এখনো চিকিৎসা মানে ভাগ্যের ওপর নির্ভরতা। এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই সময়ের সঙ্গে দৌড়—আর সেই দৌড়ে হারছে মানুষ।